
শিবজ্যোতি দত্ত
বৈশাখের ঝড়ো রাত। কালবৈশাখীর দাপটে কেঁপে উঠছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। মুষলধারে বৃষ্টি, সাথে দমকা হাওয়া। বাঁকা জলের ধারা এসে আছড়ে পড়ছে জানালার কাঁচে – ঠিক যেন কাদম্বরীর চোখের জল। বিদ্যুতের আলোয় মুহূর্তের জন্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে রবির ঘরের দেয়াল। বুকশেলফে সাজানো বইয়ের পাতা থেকে উড়ে এলো শুকনো ফুলের পাপড়ি, সেই কবে কাদম্বরী রেখে গিয়েছিল।
একুশে এপ্রিল। আজ সেই দিন। কুড়িবছর হয়ে গেল, তবু স্মৃতির ক্ষত আজও তরতাজা। চোখ বুজলে দেখতে পান – মেজবৌঠানের সেই মুখখানি, যেন শরতের জ্যোৎস্না। নয় বছরের বালিকা, তাঁর চেয়ে মাত্র দু’বছরের বড়। কিন্তু কী অদ্ভুত পরিণত ছিল তার মন! দুই শিশু, একই ছাদের নিচে, একই আকাশের নিচে বেড়ে ওঠা।
বাইরে ঝড়ের গর্জন বাড়ছে। ঝোড়ো হাওয়া যেন কাঁদছে, ডাকছে কাউকে। রবীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়ালেন। দরজা খুলে বারান্দায় এলেন। বৃষ্টির ছাট এসে লাগল মুখে। জলভেজা হাওয়া যেন কাদম্বরীর স্পর্শ। এমন ঝড়ো রাতেই তো কাদম্বরী বলতেন, “দেখো রবি, আকাশ কেঁদে উঠেছে। বর্ষা এলেই আমার কেন যেন মন উদাস হয়ে যায়।”
আজ রবীন্দ্রনাথের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। সময়ের সাথে বদলেছে শরীর, চুলে ধরেছে পাক, কিন্তু মনের সেই কোমল কোণটি এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। যেখানে কাদম্বরী জীবন্ত। সমস্ত রাজকীয় সম্মাননা, সমস্ত খ্যাতি, সাফল্যের অর্জন – সবকিছু পেরিয়েও আজ তিনি ফিরে যান সেই সহজ দিনগুলিতে, যখন কাদম্বরীর চোখেই ছিল তাঁর সৃষ্টির প্রথম প্রতিফলন। ‘ভগ্নহৃদয়’ (১৮৮১) উৎসর্গ করেছিলেন ‘শ্রীমতী হে’ কে, শুধু এই দুটি মানুষ জানতেন সেই ‘শ্রীমতী হে’ আসলে কে।
মনে পড়ল, কাদম্বরীও ভালোবাসতেন এমন ঝড়ের রাত। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতেন, “দেখো রবি, মেঘের সাথে মেঘের কী ভীষণ যুদ্ধ!” কথাগুলো যেন এখনও বাতাসে ভেসে বেড়ায়, মনের গভীরে বাজে, হৃদয়ের অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হয়। ঝড়ের প্রতিটি গর্জনে, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় যেন তাঁরই উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
ছেলেবেলার সেই দিনগুলো… কাদম্বরী তাঁর হাত ধরে নিয়ে যেতেন ছাদে। সেখানে বসে গল্প করতেন, কবিতা পড়তেন। রবি লিখতেন, আর কাদম্বরী পড়তেন – কখনও প্রশংসা, কখনও সমালোচনা। “আরও ভালো লিখতে পারো তুমি, রবি,” বলতেন হাসিমুখে।
জ্যোতিদাদা ব্যস্ত থাকতেন সারাদিন। কাদম্বরী একা। নিঃসন্তান। রবির সাথেই কাটত তাঁর সময়।
কিন্তু সময় বদলায়। রবি বড় হলেন। বিলেত থেকে ফিরলেন। বিয়ে ঠিক হল মৃণালিনীর সাথে। কাদম্বরী যেন চুপ হয়ে গেলেন। রবি ভেবেছিলেন, মেজবৌঠান খুশি হবেন। কিন্তু তাঁর চোখে দেখলেন এক অচেনা বিষণ্ণতা। সেই চোখের নীরব যন্ত্রণা আজও রবীন্দ্রনাথকে তাড়া করে ফেরে।
বিয়ের মাত্র এক মাস পরে সেই ভয়ংকর দিন। একুশে এপ্রিল, ১৮৮৪। খবর এল – কাদম্বরী আর নেই। আত্মহত্যা। সমস্ত জগৎ যেন থমকে গেল। রবি ছুটে গেলেন, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। সেই নির্জন শয্যায় শায়িত কাদম্বরীর মুখের দিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথের চোখ থেকে নেমে এসেছিল অজস্র অশ্রুধারা। আজও সেই দৃশ্য ভোলেন না তিনি।
সেই মৃত্যু রবীন্দ্রনাথকে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্য থেকেই জন্ম নিল অমর সব সৃষ্টি। চারুলতা, বিমলা, লাবণ্য – কাদম্বরীর রূপান্তর। “নষ্টনীড়” লিখতে গিয়ে বারবার মনে পড়ত সেই দিনগুলো। মনে পড়ে প্রকৃতির প্রতিশোধ (১৮৮৪) কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর মাত্র সাত দিন পর প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: “তোমাকে দিলাম।” শৈশব সঙ্গীত গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছিলেন : “বহুকাল হইল, তোমার কাছে বসিয়াই লিখিতাম, তোমাকেই শুনাইতাম।… তুমি যেখানেই থাক না কেন, এ লেখাগুলি তোমার চোখে পড়িবেই।”
এই কুড়িবছরে রবীন্দ্রনাথের জীবনে ঘটে গেছে অনেক পরিবর্তন। একদা ছোট্ট কবি এখন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ। তাঁর কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প – সবকিছুই পাঠকদের কাছে সমাদৃত। কলকাতার সাহিত্য মহলে তিনি এখন ‘কবিগুরু’। কিন্তু এইসব সাফল্যের মধ্যেও কখনো-কখনো তিনি খুঁজে ফেরেন সেই তরুণ রবিকে, যে কাদম্বরীর কাছে পড়ত তার প্রথম লেখাগুলি।
মৃণালিনীর সাথে এখন সুখী দাম্পত্য। সন্তানরা বড় হচ্ছে। পারিবারিক জীবন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বন্ধন, নতুন অনুভূতি। কিন্তু মেজ বৌঠানের প্রতি সেই অনির্বচনীয় অনুরাগ আজও তাঁর হৃদয়ের গোপন কোণে লুকিয়ে আছে – যা কেবল নিজের সৃষ্টির মাধ্যমেই প্রকাশ করতে পারেন তিনি।
শান্তিনিকেতনে বসে প্রায়ই ভাবেন, কাদম্বরী দেখলে কেমন খুশি হতেন তাঁর এই সৃষ্টিকর্ম । বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যখন মুক্ত আকাশের নীচে পড়াশুনা করে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে জ্ঞান আহরণ করে, তখন মনে হয় এই ভাবনারও প্রেরণা ছিলেন কাদম্বরী। তিনিও তো চাইতেন মুক্তির আলো, শেকল ভাঙার স্বাধীনতা।
আজ, এতদিন পরেও, বৈশাখের ঝড়ো রাতে রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেন কাদম্বরীর উপস্থিতি। বৃষ্টির সাথে যেন মিশে থাকে যেন তাঁর গলার স্বর। যেন এই ঝড়ের রাতে আশ্রয় খুঁজতে রবির কাছেই ফেরেন তিনি। ঝড়ের শব্দে যেন শুনতে পান কাদম্বরীর অস্ফুট কান্না, যা একদিন তিনি বুঝতে পারেননি, নির্বাক হয়ে রয়ে গিয়েছিল হৃদয়ের গভীরে। প্রতি বর্ষায়, প্রতি ঝড়ে, প্রতি বিদ্যুৎ চমকে তাঁকেই খুঁজে ফেরেন রবীন্দ্রনাথ। বৃষ্টিধারা যেন তাঁরই অশ্রু, বজ্রপাত যেন তাঁরই হৃদয়ের আর্তনাদ।
কাদম্বরীর মৃত্যুর পর ঠাকুরবাড়িতে আরও অনেক বিয়োগ-বেদনা এসেছে। পিতা, ভাইয়েরা, পুত্রকন্যা – একে একে অনেককেই হারিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রতিটি মৃত্যুই তাঁকে নতুন করে ভাবিয়েছে জীবনের অনিত্যতা নিয়ে। কিন্তু কাদম্বরীর মৃত্যু ছিল প্রথম আঘাত, প্রথম চিড় তাঁর আবেগের জগতে। সেই আঘাত থেকেই তাঁর সৃষ্টিতে এসেছে এক গভীর মানবিক বোধ, জীবন-মৃত্যু-প্রকৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
গভীর রাতে, এই ঝড়ের মধ্যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখনী হাতে তুলে নিলেন। ঝড় যখন প্রশমিত হচ্ছে, তখন তাঁর মনের গভীরে জেগে উঠছে নতুন এক সৃষ্টির উন্মেষ। যে সৃষ্টিতে কাদম্বরী থাকবেন চিরদিন – কখনও উপন্যাসের নায়িকা হয়ে, কখনও গানের সুরে, কখনও কবিতার ছন্দে।
বারান্দা থেকে ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ। টেবিলের কাছে বসে খুললেন খাতা। কলম হাতে নিয়ে ভাবলেন:”হে মোর চিরসঙ্গিনী, আজও কি তুমি এই ঝড়ের রাতে আমার পাশে এসে দাঁড়াও? আমার কানে কানে বলো সেই পুরোনো কথা – ‘রবি, তুমি আরও ভালো লিখতে পারো।'”
কুড়িবছর আগে সেই একুশে এপ্রিলের রাতেও এমনি ঝড় হয়েছিল। যেন প্রকৃতিও কেঁদেছিল কাদম্বরীর জন্য। আজ আবার মনে পড়ছে মেজ বৌঠানের জন্য লেখা তার সান্ধ্য সঙ্গীত
“চেয়ে তব মুখপানে বসে এই ঠাঁই
প্রতিদিন যত গান তোমারে শুনাই
বুঝিতে কি পার সখি, কেন যে তা গাই?
বুঝ না কি হৃদয়ের
কোন খানে শেল ফুটে
তব প্রতি কথাগুলি
আর্তনাদ করে উঠে!”
মৃত্যুর কুড়িবছর পরেও কাদম্বরী রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু স্মৃতি নয়, একটি জীবন্ত উপস্থিতি। ঠাকুরবাড়ির প্রতিটি কোণে, প্রতিটি বারান্দায়, ছাদে, বাগানে – সর্বত্র তিনি খুঁজে পান তাঁর ছায়া। জোৎস্নারাতের চাঁদের আলোয় দেখেন তাঁর মুখ, পুকুরের জলে তাঁর প্রতিবিম্ব। সময়ের প্রবাহে ভেসে যায়নি কাদম্বরীর স্মৃতি, বরং আরও গভীর হয়েছে, আরও মধুর।
ঘরের মৃদু আলোয় রবীন্দ্রনাথের ছায়া এলোমেলো হয়ে পড়েছে দেয়ালে। খাতার পাতায় কলম চলতে শুরু করল। আজ একুশে এপ্রিলের স্মৃতিতে যেন কাদম্বরীর আত্মা এসে ভর করেছে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। কত রাত জেগে কাদম্বরী শুনেছেন তাঁর কবিতা, গান। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে সেই সূক্ষ্ম বোধের মানুষটি, যার কাছে প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি।
চোখের সামনে ভেসে উঠল জোড়াসাঁকোর সেই বাগান। সন্ধ্যাবেলা দুজনে বসে গল্প করা, আকাশের তারা গোনা। হাসি-ঠাট্টার মাঝে কখনো গভীর আলোচনা – সাহিত্য, দর্শন, জীবন। নতুন সৃষ্টি নিয়ে উত্তেজনা আর উচ্ছ্বাস। সেই সময় জীবনের প্রতিটি দিন ছিল আবিষ্কারের আনন্দে পূর্ণ।
কুড়ি বছর পরে এখন রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারেন, কাদম্বরী শুধু তাঁর প্রথম পাঠকই ছিলেন না, ছিলেন তাঁর সৃষ্টির মূল প্রেরণা, তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। কাদম্বরীর যে সংবেদনশীল হৃদয় ছিল, তাই যেন জন্ম দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের কোমল কবিসত্তাকে।
মনে পড়ল কাদম্বরীর সেই অবাক করা গভীরতা, অসাধারণ রুচিবোধ, আর জীবনের প্রতি সংবেদনশীলতা। ক্ষণে ক্ষণে উদাসীন, আবার ক্ষণে ক্ষণে উচ্ছ্বসিত। কাদম্বরীর জন্মভূমি ছিল পূর্ববঙ্গের খুলনা। সেখানকার নদীমাতৃক জীবনের স্পর্শ ছিল তাঁর সত্তায়, তাঁর কথায়। জলের মতোই তিনি ছিলেন – কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল।
রবীন্দ্রনাথ ভাবলেন, সবার মধ্যেই তো কিছু কাদম্বরী আছে। জীবনের কোনো এক অধ্যায়ে এমন কেউ থাকে যে আমাদের সত্তার গভীরে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। শিল্পীর জীবনে তো বটেই। কাদম্বরী ছিলেন তাঁর শিল্পবোধের জাগরণী শক্তি। আজ মৃত্যুর কুড়িবছর পরেও তাঁর অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বেঁচে আছে। এটাই কি মৃত্যুর ওপারে যাওয়া নয়? রবীন্দ্রনাথ ভাবলেন, হয়তো এই পৃথিবীতেই আমাদের অমরত্ব – হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতিতে, তাদের প্রভাবে, তাদের দেওয়া প্রেরণায়।
রবীন্দ্রনাথ বাইরে তাকালেন। ঝড় ধীরে ধীরে থেমে আসছে। আকাশে উঁকি দিয়েছে চাঁদ। মেঘের ফাঁকে নক্ষত্রের ঝিলমিল। বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো এখনও ঝরে পড়ছে বারান্দার রেলিং বেয়ে। মনে হল, কাদম্বরীই বুঝি এই বৃষ্টির মাধ্যমে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছেন – যেন বলছেন, “রবি, আবার আসব পরের বর্ষায়, পরের ঝড়ে।” আকাশ জুড়ে তাঁরই হাসি, অনন্ত আকাশের বুকে, চিরকালের জন্য।
সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারলেন, মৃত্যু শেষ কথা নয়। প্রেম, স্মৃতি, সৃষ্টি – এরাই মানুষকে অমর করে রাখে। কাদম্বরী বেঁচে আছেন তাঁর সৃষ্টিতে, শব্দে, গানে। আর থাকবেন, যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে। তাঁর চোখের কোণ ভিজে উঠল, অন্তরের গভীরে কেঁদে উঠল এক নিঃশব্দ বেদনা। কিন্তু সেই বেদনার সাথে মিশে আছে এক অদ্ভুত তৃপ্তি – যে বন্ধন মৃত্যু ছিন্ন করেছিল, সৃষ্টির মাধ্যমে তা হয়েছে চিরন্তন, অক্ষয়।
