
অনুগামীদের হাতে লাঠিসোটা, বোমা, ধারালো অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে রাজনীতিকরা দিনের শেষে সবাই যে যার পিঠ চাপড়েছেন। এডিসির ভোট বিক্ষিপ্ত হিংসা আর সন্ত্রাসের মধ্যেই সাঙ্গ হয়েছে রবিবার। আর বিকেলে নেতাকুল শীতল ঘরে বসে জনগণকে অভিনন্দন জনিয়েছেন। সূচাগ্র মেদিনী ছাড়িব না- এই পণে ময়দানে নেমেছিলেন নেতাকূল। অনুগামীদের যথেষ্ট মাত্রায় অতিয়েছেন নেতারা। এক নেতার ভাষায় তার অনুগামীরা ওয়ারিয়র মানে যোদ্ধা। আর অপর নেতার ভাষায় এরা সবাই রাষ্ট্রবাদী, রাষ্ট্রহিত ছাড়া ইহাদের আর কোনও কর্ম নাই। যোদ্ধাদের নেতা আগরতলায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলটি যথেষ্ট মাত্রাতেই উপভোগ করেছেন। তরঙ্গায়িত মাধ্যমে সেনাপতির কাছে রাজের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাঠি, শাবল, গাইতি, কিরিচ, বোমা, পিস্তল হাতে যোদ্ধাদের ছোটাছুটির ছবি এসেছে। একে অপরের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে তেড়ে গেছে মাইর্যালামু কাইট্যালামু’ হুঙ্কার তো ছিলই, সাপে ছিল বাপ-দাদা চৌদ্দগোষ্ঠীর পিণ্ডি চটকানোর গালিগালাজ। এখন বিপুরায় রাজনৈতিক সেবী বা যোদ্ধাদের মুখে গালির কোনও লাগাম থাকে না। দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কুৎসিত উচ্চারণে একে অপরের পিন্ডি চটকায়। বাগে পেলেই মাথা ফাটিয়ে দেওয়া বা কোমর ভেঙে দেওয়া এখন জলভাত। নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে গত কিছুদিন প্রায় সমানে এইসব ঘটনা রাজের শান্তিপ্রিয় মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন। এমন কোনও নাগরিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি যারা পাহাড়-সমতল মেশানো এডিসি এলাকার ভোট নিয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করেননি। সর্বশেষ সতর্কবাণী যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে উচ্চারিত হয়েছে তখনই আতঙ্ক আরো বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অনুগামীদের জমি ছেড়ে না দেওয়ার জন্যে প্রশাসনিক ঢাল হিসাবে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টিও খোলাখুলি রাজনৈতিক মঞ্চেই উচ্চারণ করেছেন। তাঁর ভাষায়’ চমকাইলে ধমকাইলে ডরাইবেন না, শুধুমাত্র একটা ফোন লাগাইবেন, কেমনে দৌড়ানি দেওন লাগে আমি জনি’। মুখ্যমন্ত্রীর ওই কথায় তাঁর অনুগামীরা কতটা সাহসী হয়েছেন বুঝা না গেলেও রাজ্যের নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ যে আসন্ন হিংসার আশঙ্কায় কেঁপেছেন সেটা বিলকুল। ভোটের আগের দিনের ঘটনাবলীতে প্রতিটি সংবাদপত্রের শিরোনামেই ছিল আশঙ্কার বার্তা। ১২ই এপ্রিল সকাল সকাল যখন ভোট শুরু হয় তখনই আকাশে মেঘ ডাকছিল। ইথারে ছড়াচ্ছিল প্রস্তুতির বার্তা। বেলা বাড়তেই যোদ্ধা বা রাষ্ট্রবাদীরা একে অপরের উপর হামলে পড়ে। বোমা, পিস্তল চালানো বা হাতিয়ার নিয়ে তেড়ে যাওয়া কোনওকিছুই বাদ যায়নি সারাদিন। এমনকি সন্ধ্যারাতে ইভিএম যখন স্ট্ররুমে নিয়ে আসা হচ্ছিল তখনও যোদ্ধারা হামলাবাজি ছাড়েনি। অবশেষে সব শান্ত হয়েছে। আর এরপরই বাতাসে আছড়ে পড়েছে নেত্রকুলের বার্ত। মথার সুপ্রিমো তাঁর যোদ্ধাদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি ‘উৎসবের মেজাজে’ ভোট দেওয়ার জন্য নাগরিকদেরও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এডিসি গঠন সম্পর্কে তিনি কন্ট্রা আশাবাদী- সেই বিষয়টি সযত্বে এড়িয়ে এবার জাতি-উপজাতি সব মানুষের বিকাশের জন্য তাঁর নতুন এজেন্ডা মানুষের সামনে রাখতেও দ্বিধা করেননি প্রদ্যোতকিশোর। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি চিন সীমান্তের কাছাকাছি থাকার জন্য ভারত সরকার অরুণাচল প্রদেশকে বিশেষ প্যাকেজ দিতে পারে অহলে ত্রিপুরা পাবে না কেন। ত্রিপুরার তিনদিকেই তো বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সীমানা। এখানকার মানুষ আর্থিকভাবে দুর্বল। জাতীয় সুরক্ষার প্রশ্নে ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত স্ট্র্যাটেজিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশেষ প্যাকেজ তো ত্রিপুরা পেতেই পারে। হক কথা। প্রদ্যোত জানালেন, এবার তাঁর নতুন এজেন্ডা বিশেষ প্যাকেজ। কারণ তিনি শুধু জনজাতিদেরই নন, এই রাজ্যের সব মানুষের ভালো চান। অদের মঙ্গল কামনায় তিনি নিয়ত সচেষ্ট। প্লেটার তিপ্রাল্যান্ড, খানসা, লাস্ট ফাইট, ওয়ান নর্থইস্ট- এই দাবিগুলো যে এখনও যুক্তিপূর্ণ সেটা মানেন প্রদ্যোত। তবে সেসব তৌপুরোনো। মানুষের সামনে নতুন কিছু সবসময়ই বলতে হয়। তাই এবার ঝোলা থেকে বেরিয়ে এসেছে অরুণাচলের ন্যায় ত্রিপুরার বিশেষ প্যাকেজের দাবি। রবিবার ভোট শেষে তিনি উত্তর-পূর্বোত্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজেপির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নেত্র হিমন্ত বিশ্বশর্মীর দরবারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর বিমানের টিকিটও কাটা ছিল। কিন্তু ভোটের ময়দানে না থেকে সেনাপতি অন্য রজ্য বিহারে মনস্থ করেছেন- এই সংবাদ যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনই শ্রীযুক্ত প্রদ্যোত ওই সফর বাতিল করে সন্ধ্যারাতে যোদ্ধাদের অভিনন্দন জানানোকেই শ্রেষ্ঠ পন্থা বলে বিবেচনা করেন। সাধু। সালু। প্রদ্যোতের সাংবাদিক সম্মেলনের বিপরীতে রাষ্ট্রবাদী দলের মহা সেনাপতিও সাংবাদিকদের ডেকে ‘সফল এডিসি ভোট নিয়ে তাঁর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিজেপির রাজা সভাপতির দাবি, দলের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার যেভাবে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে তাতে ত্রিপুরার গ্রাম-পাহাড়ও যথেষ্ট মাত্রার উপকৃত। প্রধানমন্ত্রী মোদিজির নেতৃত্বে এবং রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর সুযোগ্য পরিচালনায় বিজেপি দল জনজাতিদের জন্য যেসব কাজ করে চলেছে তাতে উপকৃত হয়েই এই রাজ্যের জনজাতি অংশের মানুষ দুহাত ভরে বিজেপিকে সমর্থন জানিয়েছেন সেটিও বলতে ভুলেননি প্রদেশ বিজেপি সভাপতি। তাঁর দাবি, জনগণ যেভাবে ‘উৎসবের’ মেজাজে একেবারে ঢেলে ভোট দিয়েছেন সুতরাং এডিসিতে গেকন্যা রাজত্ব স্থাপন এখন কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা। তবে প্রদ্যোতকিশোর তাঁর যোদ্ধাদের অভিনন্দন জানালেও এডিসি দখলের যুদ্ধে জয়ের ঘণ্টা কিন্তু বাজাননি। এর বক্তব্যে কার্যত বিষয়টি তিনি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন। ভোটের আগেই রাজ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল বিজেপি এবং মথার এই সম্মুখসমর কার্যত একটি সাজানো নাটক। উভয়পক্ষ আগে থেকেই নিজেদের মধ্যে সমঝোত্ত করে নিয়েছে। তাই নেতৃত্ব রাজধানীর শীতাতপ বক্ষ ছাড়েননি। মাঠে যোদ্ধাদের ছেড়ে দিয়ে সেনাপতিরা দিনভর রিমোট কন্ট্রোলে গোটা ভোটপ্রক্রিয়ারীকেই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আর তাতে তারা একশভাগ সফল। দৃশতা দু’পক্ষের নেতাদের লড়কে লেঙ্গে অবস্থান কর্মীদের উপযুক্ত মাত্রাতেই অতানোতে সক্ষম হয়েছে। নোরা মঞ্চে তাদের গলা যত উঁউঁচু করেছেন ততটাই আবেগে আরও বেশি সক্রিয় হয়েছে তলার দিকে যোদ্ধ বা রাষ্ট্রবাদী কর্মীদল। এটাই ওরা চেয়েছিলেন। আর এই চাওয়া এবং পাওয়াতে একেবারে তালে তাল মেলানো সংশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে বলেই উভয়পক্ষ বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে তাদের অনুভবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে। সারাদিন যুদ্ধশেষে তাই সেনাপতিদের কণ্ঠে কোনও ক্লান্তি খুঁজে পায়নি মানুষ। এবার কেবল অপেক্ষা। আগামী ১৭ এপ্রিল ভিভিপ্যাট মুক্ত ইভিএমের ফলাফল গুনতে শুরু করলেই বোঝা যাবে নাটকের মূল মর্মবস্তু। অবশ্য এর মধ্যে আরও দু-একবার হুয়ার-বমকি ইত্যাদি চলতেও পারে। চুলকানির মতো চর্মরোগ বঞ্চ ছোঁয়াছে। এক পক্ষ স্বয়ার দেবে, হালুম শুলুম করবে, অন্য পক্ষে ক্রিয়া হবে না- এমনটা সম্ভব নয়। চুলকানি হবেই। আর তখনই প্রয়োজন পৃষ্ঠ কন্ডূয়ন ।

