
- সৈকত মজুমদার
পাড়ার মোড়ে জিনিয়াদের বাড়ির ওই পুরনো কাঠগোলাপ গাছটা আজও আছে, কিন্তু সময়টা বদলে গেছে অনেকটা। ছোটবেলায় যার বেড়ে ওঠা ছিল আমার চোখের মণি হয়ে, কৈশোরের সন্ধিক্ষণে সেই ছিল আমার নিষিদ্ধ আসক্তি। আমাদের সেই গোপন সম্পর্কের দিনগুলোতে শরীরের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত দহন, যা আমরা দুজনেই মেটাতে চেয়েছিলাম একে অপরের সান্নিধ্যে। সেই অবুঝ প্রেম, সেই আত্মসমর্পণ—সবটাই যেন ছিল এক তপ্ত দুপুরের গল্প।
কিন্তু শহরের হাতছানি বড় অদ্ভুত। মাধ্যমিকের পর জিনিয়া যখন শহরে পাড়ি দিল আর আমি উচ্চশিক্ষার জন্য ভিনরাজ্যে, তখনই আমাদের মাঝখানের দূরত্বটা কেবল মাইলের হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকল না। ফোনের ওপার থেকে ওর গলার স্বর ক্রমশ অচেনা হতে শুরু করল। আমি যখনই আমাদের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা তুলতাম, ও পাশ কাটিয়ে যেত। একদিন সোজাসুজি বলেই দিল, “ওসব ছেলেমানুষি ভুলে যাও, ওগুলো নিছক ভুল ছিল।”
আমি বুঝলাম, ওর মনের আকাশটা এখন অন্য কেউ দখল করেছে। শহরের কোনো এক নতুনের ছোঁয়ায় ও মুছে ফেলতে চেয়েছে আমার দেওয়া পুরনো সব স্মৃতি। আমার অধিকারবোধ তখন কেবল একতরফা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
কলেজের শেষ দিকে একদিন খবরটা পেলাম। গ্রামে রটে গেছে—শহরের সেই ছেলেটার সাথে একটা ভাড়া ঘরে একা পাওয়া গিয়েছিল জিনিয়াকে। স্থানীয় ক্লাবের ছেলেরা নাকি জোর করে ওদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। খবরটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন রিক্ততায় ভরে গেল।
জিনিয়া এখন অন্য কারোর বৈধ ঘরণী। আমাদের সেই বসন্তের আগুন, সেই না বলা গোপন কথাগুলো আজ কেবল আমার ডায়েরির পাতায় বন্দি। যে জিনিয়াকে আমি তিল তিল করে চিনেছিলাম, সে আজ আমার চেনা পৃথিবীর বাইরের এক অপূর্ণ উপাখ্যান।
ট্রেনের জানালায় মাথা রেখে যখন নিজের শহরে ফিরছিলাম, তখন কানে বাজছিল সেই লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে দেওয়া বিয়ের খবরটা। স্টেশন থেকে নেমে সোজা আমাদের সেই পুরনো কাজুবাদাম বাগানটার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম, যেখানে একসময় লুকোচুরি খেলতাম আমরা। ঠিক তখনই দেখলাম জিনিয়াকে। অটো রিক্সা থেকে নামছে, পরনে চওড়া লাল পাড়ের বেনারসী শাড়ি, কপালে সিঁদুরের একটা ম্লান রেখা। আমাকে দেখে ওর চোখের পাতাটা একবার কেঁপে উঠল। সেই পরিচিত চাউনি, কিন্তু সেখানে আজ কোনো দাবি নেই, শুধু একরাশ কুণ্ঠা। আমি এগিয়ে গিয়ে শুধু বললাম, “সবই তো ভুলে যেতে বলেছিলে জিনিয়া, তাহলে এই জবরদস্তির পরিণতিটা কি তোমার খুব কাম্য ছিল?” জিনিয়া মাথা নিচু করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ভিজে গলায় ফিসফিস করে বলল, “শহরের জৌলুস আমায় অন্ধ করেছিল ঠিকই, কিন্তু শেকলটা যে এভাবে পায়ে পড়বে ভাবিনি। আমি তো মুক্তি চেয়েছিলাম, অথচ আজ এক অন্য খাঁচায় বন্দি।”
আমি বুঝলাম, ও আমাকে এড়িয়ে চলতে চাইলেও ওর ভেতরের সেই অপরাধবোধ ওকে শান্তি দেয়নি। আমরা দুজনেই হারলাম—আমি আমার শৈশবের প্রথম প্রেমকে হারালাম, আর ও হারাল নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অধিকার। বিকেলের মরা রোদে ওর সিঁদুরটা বড্ড ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল, ঠিক যেন আমাদের সেই অকালপক্ক বসন্তের এক ঝরা পলাশ।
